এক, বাংলার উপর আক্রমণ, দুই, এনআরসি। এই দুই ইস্যুতে এবার কি ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? এতদিন সরকারী একাধিক প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ছিল হাতিয়ার। তবে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আর পরিষেবার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নয়, বরং বাংলার অস্মিতার উপর জোড় দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি আর বাঙালীর উপর আক্রমণ, এই তিন তীরে কি ২৬ এর লক্ষ্যভেদ করতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী?
আগামী বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। হাতে গোনা আর কয়েকমাস। একদিকে শুভেন্দুর নেতৃত্বে হিন্দুত্বের জিগির, আর তারই পাল্টা হিসাবে এনআরসি, এসআইআর ও বঙ্গ অস্মিতাকে ভোট যুদ্ধের অস্ত্র করতে চাইছেন মমতা। ২৬ এর নির্বাচনের সামনে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বাঙালি হেনস্তা ইস্যুকে তাই নিয়ম করে বাঙালি ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন তিনি। নতুন ভাষা আন্দোলনের কথা ২১ জুলাই মঞ্চে বলেই চুপ না থেকে বোলপুর থেকে প্রথমে আর ঝাড়গ্রাম থেকে দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন শুরু করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রামের মঞ্চ থেকে তাই বাংলা আর বাঙালীর উপর আক্রমণ শুধু নয়, বরং সামনে নিয়ে এলেন সেই এনআরসি ইস্যুকে। ঝাড়গ্রামের আদিবাসী ভোটারদের সামনেই ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দেওয়ার আতঙ্কের কথাও তুলে ধরলেন বিশ্ব আদিবাসী দিবসে।
আর আচমকাই ন্যায্য ভোটারদের নাম বাদ দিতে যে বিজেপি তৎপর, আড়েভারে তা বুঝিয়েও দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক কথায় একে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা, তা আবার দেখতে হবে। কেন্দ্র নাম বাদ দিতে নতুন করে চক্রান্ত করেছে। না জেনে ফর্ম ফিলআপ করবেন না। নতুন ভোটার যাঁরা হচ্ছেন মনে রাখবেন বাবা-মায়ের সার্টিফিকেট লাগবে। এটা ডবল ইঞ্জিনের সরকারের চক্রান্ত। নাম বাদ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চক্রান্ত।” ধর্মীয় কারণ সহ একাধিক কারণে ওপার বাংলার প্রচুর মানুষ চলে এসেছে এই দেশে যাদের মধ্যে অনেকটাই সনাতনী বা মতুয়া, যে ভোটগুলো সাধারণত বিজেপির টার্গেট। এর আগের একাধিক লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে এই ওপার থেকে আসা ভোটারদের ভোট গিয়েছিল বিজেপির বাক্সে, এই ইস্যুতে বিজেপি নয় বরং তিনি যে
পাশে যে তিনিই আছেন তা মনে করিয়ে বিজেপি যে ওপার থেকে যন্ত্রনা নিয়ে আসা মানুষগুলোকে আবার বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা বিজেপি করছে বলে মনে করিয়ে দিলেন মমতা। বলেন, “যাঁরা বাংলাদেশ থেকে আইন মেনে এসেছেন তাঁরা এদেশের নাগরিক। অনুপ্রবেশকারী ইস্যু আমাদের হাতে নেই। কেন বলছেন? চিঠি পাঠাচ্ছে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, মতুয়াদের। আমাদের বাংলার মানুষরা লড়াই করল। সংগ্রাম করল। আর বিদেশি? তোমরা একা স্বদেশি? এই জিনিস আমরা বরদাস্ত করব না। মানব না। রুখে দাঁড়াবেন।” একই সাথে ভিনরাজ্যে বাঙালি হেনস্তা নিয়ে আরও একবার তোপ দাগেন মমতা। বলেন, “প্রত্যেক মানুষের একটা ভাষা আছে। ভাষা তাঁর সম্মান, গর্ব। আর বলছে বাংলা ভাষাই নেই। এদের কী বলব বলুন? নীরবে বুকটা ফেটে যায়। ওরা বাজে কথা বলে আমরা বলতে পারি না। আমরা মর্মাহত, শোকাহত। মানুষের উপর অত্যাচার হচ্ছে বাংলার। ২ হাজারের বেশি ফিরিয়ে এনেছি। গুরগাঁও, অসম, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে অত্যাচার করছে। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভোটের আগে বলবে টাকা নাও আর ভোট দাও। তুমি টাকা দেওয়ার কে? ওটা মাটির টাকা, তোমার টাকা নয়। সব দেবেন। নিজের ঠিকানা দেবেন না। নিজের ভাষা দেবেন না। নিজের অস্তিত্ব দেবেন না। বাংলা ভাষায় কথা বললেই বলছে রোহিঙ্গা। জাতীয় সঙ্গীত কোন ভাষায় লেখা? বাংলা ভাষা। যখন মানুষ বিপদে পড়ে ভেদাভেদ করে না।”
এমনকী বিজেপির হিন্দুত্বের পাল্টা ২৬ শের নির্বাচনে কোন দুটি ইস্যুকে সামনে রেখে ভোট দেবেন সাধারণ মানুষ, তাও বাতলে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পষ্ট করে বললেন, ” মনে রাখবেন ভোটার লিস্ট আর ভাষার সম্মান কেউ ছাড়বেন না। মতুয়াদের উপর মুম্বইতে অত্যাচার হচ্ছে। মুম্বইতে একজনকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করে বস্তায় তোলা হয়েছে। নিজের ভাষায় কথা বলাটা অপরাধ?”
আসলে ঝাড়গ্রামের সভা থেকে একদিকে বাঙালি অস্মিতা অপরদিকে ভোটার লিস্ট, এই দুই ইস্যুতে যে তিনি ২৬শে ফের সেঞ্চুরী করতে চান, তা বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।







