“যারা দিদিকে গালাগাল দেয় অসম্মানিত করে, দিদি তাদেরকেই সম্মানিত করে।”— অবাক হলেও এই বক্তব্যটি তৃণমূলের শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের।
আসল ঘটনা, দলীয় সাংসদদের নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যাযের ভার্চুয়াল মিটিং, আর তারপরই বিস্ফোরক কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। না শুধু বিস্ফোরক বললে হয়তো কম বলা হবে, শেষে কিনা আক্রমণই করে বসলেন দলনেত্রীকেই! সোমবার লোকসভায় এবং রাজ্যসভায় কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণের এবং ইন্ডিয়া জোটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নরেন্দ্র মোদি সরকারের বিরুদ্ধে কিভাবে আরও বেশি আক্রমণ শানানো যায়, তা নিয়ে দলের সাংসদদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠকে বসেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সূত্রের খবর ওই বৈঠকেই লোকসভার সাংসদদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। এমনকি লোকসভায় দলীয় সাংসদদের ফুল মার্কস দিলেও লোকসভার সাংসদদের কাজে যে তিনি অখুশি তা স্পষ্ট করে দেন। বিশেষ করে হাউজের ফ্লোরে সমন্বয়ের অভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে বলেও সেই বৈঠকে তিনি জানান। এমনকী লোকসভায় তৃণমূল দলনেতার দায়িত্ব থেকে সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরিয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেন। তবে মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব বহাল রাখেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সূত্রের খবর লোকসভায় তৃণমূলের মুখ্য সচেতক হিসেবে নাম ঘোষণার পরই কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেই পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপরই একের পর এক বিস্ফোরক অভিযোগ করেন কল্যাণ। এমনকী দলীয় সাংসদদের পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়? এখানেই শেষ নয়, তীব্র কটাক্ষ করেন খোদ দলনেত্রীকেই? তৃণমূলের সাংসদরা যে লোকসভাতেই আসেন না, এদিন তা নিয়ে প্রথম ক্ষোভ উগরে দিয়ে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় দিনের পর দিন লোকসভায় আসেন না। সে অসুস্থ হয়ে থাকলে সেটা কি আমার দোষ। আমি একা একা লোকসভা চালাব নাকি? কাকলি ঘোষ দস্তিদার প্রতিদিন লোকসভায় থাকেন না, সেটাও কি আমার দোষ? লোকসভায় আমাদের কজন সদস্য থাকেন বলুন তো, সবাই তো বাড়িতে বসে থাকে। নয়তো নিজের লোকসভা কেন্দ্রে।” এমনকি দলীয় সাংসদদের নাম ধরে ধরে তাদের পারফরমেন্স নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায় কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি বলেন, “পার্থ ভৌমিক কখনও লোকসভায় আসবে না, বাঁকুড়া এমপি অরূপ চক্রবর্তী আসেনি। দক্ষিণ কলকাতায় একদিন মাত্র আসবে। কি বলছেন কি? দেব কি করে কিছুই বুঝতে পারি না।” এদিনই নিজের বক্তব্যে সরাসরি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে চ্যালেঞ্জ করে বসেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। বলেন, “কিভাবে লোকসভা চালাতে হয়, মমতা দি কি জানেন? কারা আসে কারা আসে না সেটা কি উনি জানেন?” অধিবেশন চলাকালীন সংসদ সদস্যদের এই অধিবেশনে থাকা সাধারণত দস্তুর, কিন্তু বাংলা থেকে জেতা তৃণমূল সদস্যরা যে আদৌ লোকসভাতে উপস্থিত থাকেন না, এদিন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাও স্পষ্ট করে দেন। বলেন, “কাকলি কখন আসে কখন চলে যায় জানি না। একমাত্র প্রতিমা মণ্ডল, সায়নী ঘোষ, বাপি হালদার, আবু তাহের এরা থাকে, এই তো কয়েকজন। উনি তখন কখনও বাকিদের বলেন না, কেন তোমরা লোকসভাটা ঠিকঠাক করো না? আমার দোষ? উনি যাদের এমপি বানিয়েছেন তাঁরা কেউ লোকসভায় আসে না। দক্ষিণ কলকাতার এমপি ৭ বছর হল একটাও স্পিচ নেই, মেন্সন নেই। সব এমপি হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ নাটক করছে, থিয়েটার করছে, সেটাও আমার দোষ। বলছে কো-অর্ডিনেশন হচ্ছে না।” কল্যাণের আরও সংযোজন, “চেঁচানোর জন্য কে? কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। উনি তো কাউকে লোকসভায় আসতে বলেন না। আসলে মমতা দি শুধু আমার দোষ দেখে, অন্যের দোষ দেখে না। ৬ বছর হয়ে গেল একেক জন লোকসভায় মুখ পর্যন্ত খোলে না।” সূত্রের খবর সোমবারের বৈঠকে লোকসভার সাংসদদের পারফরম্যান্স বিচার করতে গিয়ে কার্যত কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপর অনেকটা ক্ষুব্ধ হন তৃণমূল সুপ্রিমো। যেহেতু তিনি দলের মুখ্য সচেতক, তাই লোকসভায় সাংসদদের খারাপ পারফরমেন্স নিয়ে পরোক্ষভাবে কল্যাণকে দায়ী করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যা নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে শ্রীরামপুরের সাংসদ বলেন, “আমি বড়লোকের ছেলে নই। অক্সফোর্ড-কেমব্রিজ থেকে পড়ে আসিনি। সবচেয়ে বেশি কাজ করেছি লোকসভায়। সবচেয়ে বেশি অ্যাক্টিভ থাকি স্লোগান দিই সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ দেখাই। আর আমি নাকি ইন-এফেক্টিভ! যদি হার্ভার্ড-অক্সফোর্ড থেকে পড়াশোনা করে আসতাম, দামি শাড়ি পরতাম, বিশাল ইংরেজি বলতাম তাহলে দলে সবথেকে বেশি এফেক্টিভ আমি হতাম। যথেষ্ট হয়েছে, অনেকদিন চিফ হুইপের কাজ করেছি আর না।” গোটা বিষয় নিয়ে কার্যত নাম করেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে কল্যাণের বিশ্লেষণ, “যারা দিদিকে গালাগাল দেয় অসম্মানিত করে, দিদি তাদেরকেই সম্মানিত করে। এটাই এই দলের এখন নীতি হয়ে গেছে।” যদিও রাজনৈতিক মহলের মতে, এক মহুয়া মৈত্রকে নিয়ে বারে বারে তাঁর অস্বস্তির কথা দলকে জানালেও দল প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলনেতা হওয়া কল্যাণের মুখ্য সচেতকের দায়িত্ব ছাড়ার অন্যতম কারণ।







