অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জয় নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য শুভেন্দুর

নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে ভোটের বৈতরণী পেরোতে চাইছে বিজেপি— এমন অভিযোগ তুলে ইন্ডিয়া জোটের শরিক দলের সাংসদরা গত কয়েক সপ্তাহ জুড়ে সংসদ এবং সংসদের বাইরে বিক্ষোভ দেখাচ্ছেন। এমনকী কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও ২০২৪ সালের ভোটার লিস্ট ধরে ধরে বারাণসী সহ একাধিক কেন্দ্রের ভোট কারচুপির তথ্য সামনে আনছেন। স্বাভাবিক ভাবেই গোটা দেশজুড়ে মোদী সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভোট চোর’ শ্লোগান তুলছেন বিরোধীরা। এই আবহে এবার বাংলায় তৃণমূলের বিরুদ্ধেই পাল্টা ভোট চুরির অভিযোগ তুললেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর অভিযোগের তির ডায়মন্ড হারবার লোকসভা কেন্দ্রে থেকে জয়ী তৃণমূলের সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে। ২০২৪ লোকসভা ভোটে ডায়মন্ড হারবার কেন্দ্র থেকে রেকর্ড ৭ লক্ষ ১০ হাজার ভোটে জিতেছেন অভিষেক। এবার এই জয়ের ব্যবধান নিয়েই সরব হল রাজ্য বিজেপি। প্রসঙ্গত, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই বিপুল মার্জিনের জয় নিয়ে এর আগে প্রশ্ন তুলেছিলেন বিজেপি নেতা অনুরাগ ঠাকুর। তিনি রীতিমত সাংবাদিক সম্মেলন করে ডায়মন্ড হারবারে লক্ষ লক্ষ ভুয়ো ভোটার আছে বলে দাবি করেছিলেন। যদিও তারপরেই অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর প্রতিনিধি মারফত অনুরাগ ঠাকুরের বাড়িতে সমস্ত তথ্য সম্বলিত ভিডিয়ো ডেটা পাঠিয়েছিলেন। রাজ্যে এসআইআর নিয়ে টালবাহানার মধ্যে আবারও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দিকে অভিযোগের আঙুল তুললেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা। সম্প্রতি বিজেপির এক সভা থেকে তিনি মন্তব্য করেন, “তিনি নাকি ৭ লক্ষ ভোটে জিতেছেন। জানেন, ৯০০-র বেশি বুথে সেলোটেপ লাগানো ছিল। প্রতি বুথে ৮ জন করে পোলিং এজেন্ট, আর বাইরে ছিল জাহাঙ্গির বাহিনী। আপনি যদি গিয়ে ভিতর থেকে চিৎকার করেন, যে আমি পদ্মফুল বা অন্য কোনও প্রতীক খুঁজে পাচ্ছি না, তাহলে আপনি যখন বুথ থেকে বেরোবেন, তখনই মারবে। আবার যদি নাও টেপেন, শব্দ না হয়, তাও মারবে। এই করে সাত লক্ষ ভোটে জিতেছে।” সব মিলিয়ে অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগে সরগরম বঙ্গ রাজনীতি। আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই উত্তাপ যে আরও বাড়বে তা এখনই স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে।
২৬শে বিজেপির হিন্দুত্বের পাল্টা ইস্যু যে বাঙালি অস্মিতা, বুঝিয়ে দিলেন মমতা

এক, বাংলার উপর আক্রমণ, দুই, এনআরসি। এই দুই ইস্যুতে এবার কি ভোট বৈতরণী পার হতে চাইছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? এতদিন সরকারী একাধিক প্রকল্পে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা ছিল হাতিয়ার। তবে আগামী বছর বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে আর পরিষেবার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় বঞ্চনা নয়, বরং বাংলার অস্মিতার উপর জোড় দিচ্ছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি আর বাঙালীর উপর আক্রমণ, এই তিন তীরে কি ২৬ এর লক্ষ্যভেদ করতে চাইছেন তৃণমূল নেত্রী? আগামী বছরই রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। হাতে গোনা আর কয়েকমাস। একদিকে শুভেন্দুর নেতৃত্বে হিন্দুত্বের জিগির, আর তারই পাল্টা হিসাবে এনআরসি, এসআইআর ও বঙ্গ অস্মিতাকে ভোট যুদ্ধের অস্ত্র করতে চাইছেন মমতা। ২৬ এর নির্বাচনের সামনে ভোটার তালিকা সংশোধন এবং বাঙালি হেনস্তা ইস্যুকে তাই নিয়ম করে বাঙালি ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন তিনি। নতুন ভাষা আন্দোলনের কথা ২১ জুলাই মঞ্চে বলেই চুপ না থেকে বোলপুর থেকে প্রথমে আর ঝাড়গ্রাম থেকে দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন শুরু করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার ঝাড়গ্রামের মঞ্চ থেকে তাই বাংলা আর বাঙালীর উপর আক্রমণ শুধু নয়, বরং সামনে নিয়ে এলেন সেই এনআরসি ইস্যুকে। ঝাড়গ্রামের আদিবাসী ভোটারদের সামনেই ভোটার লিস্ট থেকে নাম বাদ দেওয়ার আতঙ্কের কথাও তুলে ধরলেন বিশ্ব আদিবাসী দিবসে। আর আচমকাই ন্যায্য ভোটারদের নাম বাদ দিতে যে বিজেপি তৎপর, আড়েভারে তা বুঝিয়েও দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এক কথায় একে ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “ভোটার তালিকায় নাম আছে কিনা, তা আবার দেখতে হবে। কেন্দ্র নাম বাদ দিতে নতুন করে চক্রান্ত করেছে। না জেনে ফর্ম ফিলআপ করবেন না। নতুন ভোটার যাঁরা হচ্ছেন মনে রাখবেন বাবা-মায়ের সার্টিফিকেট লাগবে। এটা ডবল ইঞ্জিনের সরকারের চক্রান্ত। নাম বাদ দিয়ে বাংলাদেশে পাঠানোর চক্রান্ত।” ধর্মীয় কারণ সহ একাধিক কারণে ওপার বাংলার প্রচুর মানুষ চলে এসেছে এই দেশে যাদের মধ্যে অনেকটাই সনাতনী বা মতুয়া, যে ভোটগুলো সাধারণত বিজেপির টার্গেট। এর আগের একাধিক লোকসভা ও বিধানসভা নির্বাচনে এই ওপার থেকে আসা ভোটারদের ভোট গিয়েছিল বিজেপির বাক্সে, এই ইস্যুতে বিজেপি নয় বরং তিনি যে পাশে যে তিনিই আছেন তা মনে করিয়ে বিজেপি যে ওপার থেকে যন্ত্রনা নিয়ে আসা মানুষগুলোকে আবার বাস্তুচ্যুত করার চেষ্টা বিজেপি করছে বলে মনে করিয়ে দিলেন মমতা। বলেন, “যাঁরা বাংলাদেশ থেকে আইন মেনে এসেছেন তাঁরা এদেশের নাগরিক। অনুপ্রবেশকারী ইস্যু আমাদের হাতে নেই। কেন বলছেন? চিঠি পাঠাচ্ছে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, মতুয়াদের। আমাদের বাংলার মানুষরা লড়াই করল। সংগ্রাম করল। আর বিদেশি? তোমরা একা স্বদেশি? এই জিনিস আমরা বরদাস্ত করব না। মানব না। রুখে দাঁড়াবেন।” একই সাথে ভিনরাজ্যে বাঙালি হেনস্তা নিয়ে আরও একবার তোপ দাগেন মমতা। বলেন, “প্রত্যেক মানুষের একটা ভাষা আছে। ভাষা তাঁর সম্মান, গর্ব। আর বলছে বাংলা ভাষাই নেই। এদের কী বলব বলুন? নীরবে বুকটা ফেটে যায়। ওরা বাজে কথা বলে আমরা বলতে পারি না। আমরা মর্মাহত, শোকাহত। মানুষের উপর অত্যাচার হচ্ছে বাংলার। ২ হাজারের বেশি ফিরিয়ে এনেছি। গুরগাঁও, অসম, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশে অত্যাচার করছে। বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ভোটের আগে বলবে টাকা নাও আর ভোট দাও। তুমি টাকা দেওয়ার কে? ওটা মাটির টাকা, তোমার টাকা নয়। সব দেবেন। নিজের ঠিকানা দেবেন না। নিজের ভাষা দেবেন না। নিজের অস্তিত্ব দেবেন না। বাংলা ভাষায় কথা বললেই বলছে রোহিঙ্গা। জাতীয় সঙ্গীত কোন ভাষায় লেখা? বাংলা ভাষা। যখন মানুষ বিপদে পড়ে ভেদাভেদ করে না।” এমনকী বিজেপির হিন্দুত্বের পাল্টা ২৬ শের নির্বাচনে কোন দুটি ইস্যুকে সামনে রেখে ভোট দেবেন সাধারণ মানুষ, তাও বাতলে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। স্পষ্ট করে বললেন, ” মনে রাখবেন ভোটার লিস্ট আর ভাষার সম্মান কেউ ছাড়বেন না। মতুয়াদের উপর মুম্বইতে অত্যাচার হচ্ছে। মুম্বইতে একজনকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে খুন করে বস্তায় তোলা হয়েছে। নিজের ভাষায় কথা বলাটা অপরাধ?” আসলে ঝাড়গ্রামের সভা থেকে একদিকে বাঙালি অস্মিতা অপরদিকে ভোটার লিস্ট, এই দুই ইস্যুতে যে তিনি ২৬শে ফের সেঞ্চুরী করতে চান, তা বুঝিয়ে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘মমতাকে এবার ভবানীপুরে হারাব’— শুভেন্দু অধিকারী

ফের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর চ্যালেঞ্জ দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। তবে এবার আর নন্দীগ্রাম নয়, লক্ষ্য— ভবানীপুর। এবার কি তবে হাইভোল্টেজ লড়াই হতে চলেছে ভবানীপুরে? মঙ্গলবার বাগডোগরা বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে নন্দীগ্রামের পর খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড় ভবানীপুরেই তাঁকে হারানোর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন শুভেন্দু অধিকারী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে বিরোধী দলনেতার স্পষ্ট বক্তব্য, “মমতাকে আমি নন্দীগ্রামে হারিয়েছি, এবার ২০২৬ এ ভবানীপুর হারাব।” প্রসঙ্গত ২০২১ সালে নির্বাচনে পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে ১৯৫৬ ভোটে বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নির্বাচনে শুভেন্দু অধিকারী ১,১০,৭৬৪ টি ভোট পান, আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পান ১ লক্ষ ৮ হাজার ৮০৮টি ভোট, শতাংশ হিসেবে শুভেন্দু অধিকারী পান ৪৮. ৪৯ শতাংশ, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পান ৪৭. ৬৪ শতাংশ ভোট। অপরদিকে ওই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে ভবানীপুর থেকে তৃণমূল প্রার্থী হন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ভোট পান ৮৫,২৬৩ টি ভোট। অপরদিকে বিজেপি প্রার্থী প্রিয়াঙ্কা টিব্রেওয়াল পান ২৬,৪২৮টি ভোট। এদিন শুভেন্দু বার্তা দেন, “আমাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। তৃণমূলের মালিককে হারিয়েছি মনে রাখবেন। শুভেন্দু অধিকারীকে ভয় দেখানো যাবে না। যখন সিপিএমের সময় , সিপিএম যখন ২৩৫ তখন লক্ষ্মণ শেঠকে হারিয়েছি।”