অভয়ার বাবার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করলেন কুণাল ঘোষ

আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের খুন ও ধর্ষণ কাণ্ডের একবছর পূর্ণ হলেও, তাঁদের মেয়ে ন্যায় বিচার পায়নি বলে সংবাদ মাধ্যমের সামনে সরব হয়েছিলেন অভয়ার বাবা-মা। তাঁদের অভিযোগ রাজ্য সরকার সব রকম ভাবে চেষ্টা করছে যাতে সিবিআই এই তদন্ত ছেড়ে দিক। এমনকী সম্প্রতি দিল্লিতে গিয়ে তাঁরা সিবিআই ডিরেক্টর প্রবীণ সুদের সঙ্গেও দেখা করেন। তিনিও এই মামলার থেকে সরে যাওয়ার কথাই জানান তাঁদের। এই ইস্যুতে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়াতে নবান্ন অভিযানেরও ডাক দেন নির্যাতিতার মা-বাবা। পাশাপাশি সংবাদ মাধ্যমের সামনে কুণাল ঘোষের নাম ধরেই তাঁরা অভিযোগ করেন যে, “সিবিআই-কে টাকা খাইয়েছে রাজ্য সরকার। কুণাল ঘোষ গিয়ে সেটেলমেন্ট করে এসেছেন।” এই অভিযোগের পাল্টা কুণাল ঘোষ নিজের সোস্যাল সাইটে লেখেন, “মিথ্যাচার ও নাটকের সব সীমা পার করেছেন উনি।” অভয়ার বাবা একাধিকবার অভিযোগ করেছেন যে, সিবিআই রাজ্য সরকারের থেকে টাকা খেয়ে এই তদন্ত চেপে রেখেছে। পাশাপাশি তাঁদের অভিযোগের তির ছিল তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষের দিকে। তাঁদের বক্তব্য অনুসারে কুণাল ঘোষ সিজিও কমপ্লেক্সে গিয়ে পুরো বিষয়টিই সেটেলমেন্ট করে এসেছেন। এরপর গত ১২ আগস্ট তিলোত্তমার বাবাকে আইনি নোটিস পাঠান কুণাল ঘোষ। সেই নোটিশে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, চার দিনের মধ্যে জবাব না পেলে আদালতে যাবেন তিনি। এবার ব্যাঙ্কশাল আদালতে তিলোত্তমার বাবার বিরুদ্ধে মানহানির মামলা দায়ের করলেন কুণাল ঘোষ। কুণাল ঘোষের দাবি, একটি রাজনৈতিক দলের প্ররোচনায় তাঁরা এ ধরনের কথাবার্তা বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন। এমনকী গত ৯ আগস্ট বিজেপিকে সঙ্গে নিয়ে নবান্ন অভিযান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কুণাল ঘোষ। পাশাপাশি তাঁর দাবি, অভয়ার বাবা-মায়ের প্রতি যথেষ্ট সহানুভূতি দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু সবকিছুরই তো একটা সীমা আছে। তাই লাগাতার তাঁর নাম করে সংবাদ মাধ্যমের সামনে মুখ খোলায় অভয়ার বাবার বিরুদ্ধে ব্যাঙ্কশাল কোর্টে মানহানির মামলা করলেন কুণাল ঘোষ।
অভয়ার মায়ের উপর পুলিশি আক্রমণের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের

আরজি কর কাণ্ডের বর্ষপূর্তিতে মেয়ের ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে গত ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানে পা মেলান অভয়ার বাবা-মা। পার্কস্ট্রিটের কাছে তাঁদের মিছিল আটকানো হয়। অভিযোগ ওঠে, সেইসময় নির্যাতিতার বাবা-মাকে পুলিশ মারধর করে। তারপরও তাঁরা নবান্নে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। কিন্তু রেসকোর্সের পাশে অবস্থান চলাকালীনই অসুস্থ হয়ে পড়েন অভয়ার মা। চোখেমুখে জল দেওয়ার পরেও অসুস্থ বোধ করতে থাকেন তিনি। সেই পরিস্থিতিতে নির্যাতিতার মা এবং বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গত রবিবার হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় অভয়ার মাকে। এবার এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন অভয়ার বাবা। জানা যাচ্ছে, সোমবার শেক্সপিয়র সরণী থানায় অনলাইনে একটি মেইল পাঠিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। অভিযোগপত্রে অভয়ার বাবার দাবি, পুলিশ অভয়ার মায়ের মাথায় ও পিঠে আঘাত করে। এর জেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যদিও এর আগে নির্যাতিতার বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর স্ত্রীর কপালে যে চোট লেগেছে, সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট নাকি হাসাপতালের তরফ থেকে ‘বদলে’ ফেলা হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, সরকারের চাপে হাসপাতাল তাঁর স্ত্রীকে ভর্তি নেয়নি। যদিও মাথায় চোট লাগায় নির্যাতিতার মাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছিল হাসপাতাল। রবিবার তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ নিয়ে অভয়ার মা সেসময় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিল, “কলকাতা পুলিশই আমাকে মেরেছে। পুরুষ ও মহিলা পুলিশ মিলে আমাকে লাঠিপেটা করেছে। আমার শাঁখা ভেঙে দিয়েছে। আমার পিঠে লেগেছে। আমাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এমনকী ওর বাবাকেও মেরেছে। কেন আমায় মারা হল? কেন আমার মেয়েকে কাজের জায়গায় মারা হল? কেন প্রশাসন তৎপর হল না সেদিন?” যদিও পুলিশের তরফ থেকে অভয়ার মায়ের ওপর লাঠিচার্জের সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করা হয়। এবার সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই থানায় লিখিত অভিযোগ জানালেন অভয়ার বাবা। তাঁর বাবার অভিযোগ, “রাজ্য সরকারের চাপে মেডিক্যাল রিপোর্টও বদলে দিয়েছিল হাসপাতাল। ডিসচার্জ রিপোর্টে কোথাও রোগীর বয়ানে আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল না। পরে আমাদের আইনজীবীর প্রশ্নের মুখে পড়ে রিপোর্ট বদল করে মায়ের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয় হাসাপাতালের ডিসচার্জ রিপোর্টে।” এবার সেই রিপোর্টের কপি সহ মেইল করে সেক্সপীয়র সরণী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন অভয়ার বাবা। এখন দেখার, এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আদৌ কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা।
‘আরজি কর কাণ্ডে প্রকৃত দোষী শাস্তি পায়নি’— বিস্ফোরক দাবি চিরঞ্জিতের

আরজি করের তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার এক বছর পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু অভয়া কাণ্ডের ন্যায় বিচার নিয়ে দড়ি টানাটানি এখনও অব্যাহত। অভয়ার বাবা-মায়ের দাবি, তাঁদের মেয়ে ন্যায় বিচার পায়নি। প্রকৃত অপরাধী এখনও ধরা পড়েনি। এর জন্য রাজ্য সরকারকে দায়ী করেছেন তাঁরা। তাঁদের অভিযোগ, মুখ্যমন্ত্রী পরিকল্পিত ভাবেই পুরো বিষয়টিকে ধামাচাপা দিতে চাইছেন। এক্ষেত্রে সরকারের উদিচ্ছার অভাবকেই দায়ী করছেন তাঁরা। সেকারণেই ৯ আগস্ট নবান্ন অভিযানের ডাক দেন অভয়ার বাবা-মা। এবার অভয়ার মা-বাবার সুরেই সুর মেলালেন তৃণমূল বিধায়ক তথা অভিনেতা চিরঞ্জিৎ চট্টোপাধ্যায়। তিনিও মনে করেন, আরজি কর তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ-খুনে প্রকৃত অপরাধীরা ধরা পড়েনি। তাঁর বক্তব্য, “আমি আমার দিক থেকে বলতে পারি, এর কিন্তু সমাধান হতেই হবে। আমার মনে হয় না, দোষীরা এখনও সাজা পেয়েছে। আমার কেন, কারও মনে হয় না। সিবিআই চোখ বন্ধ করে আছে।” পাশাপাশি নবান্ন অভিযানে গিয়ে অভয়ার মায়ের কপালে আঘাত লাগার প্রসঙ্গে দুঃখপ্রকাশ করে চিরঞ্জিৎ সরাসরি বিজেপিকে নিশানা করে বলেছেন, “কে করেছে তা তো বোঝা যাচ্ছে না। যাঁরা নিয়ে গিয়েছিলেন ওঁদের, তাঁদের নিরাপত্তা দেওয়া উচিত ছিল। বিজেপি ঘিরে ছিল ওঁদের, তারপরেও যদি উনি আহত হন তাহলে বুঝতে হবে সেই ঘেরাটা সঠিক হয়নি। তবে আমি খুব দুঃখিত, আমি মর্মাহত, যে ওঁর লেগেছে। একেবারেই উচিত ছিল না।” যদিও চিরঞ্জিতের বক্তব্যের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় অভয়ার বাবা কিছুটা কটাক্ষের সুরেই বলেছেন যে, দলের অবস্থানের বাইরে গিয়ে চিরঞ্জিৎ এভাবে মন্তব্য করায় তাঁকে না আবার শাস্তির মুখে পড়তে হয়। পাশাপাশি তাঁর আরও অভিযোগ, “গত ৯ তারিখ যেদিন আমার মেয়ের সঙ্গে এই ঘটনা ঘটে, সেদিন কলকাতা পুলিশ, আরজি কর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং তৃণমূল দল আমাদের ওপর যে অত্যাচার চালিয়েছিল, তার সমাধান যদি না হয়, আমরা এর বিচার পাব না। বিশ্বের সেরার সেরা তদন্ত কমিটিও যদি আসে, এর বিচার পাওয়া মুশকিল। কলকাতা পুলিশকে আগে সঠিকভাবে তথ্যপ্রমাণ দিতে হবে। আদালত চাইলেই সিবিআইকে দিয়ে সঠিক তদন্ত করাতে পারে। কিন্তু সেই আদালতেই রাজ্য সরকার আমাদের বিরোধিতা করছে, যাতে আমরা ন্যায় বিচার না পাই। এমনকী গত শনিবার নবান্ন অভিযানে আমাদের উপর অহেতুক পুলিশি আক্রমণ করে সরকার আরও একবার প্রমাণ করে দিল, এক বছর আগে আমরা যে তিমিরে ছিলাম সেখানেই আছি। সরকারকে তার অবস্থান থেকে টলাতে পারিনি।” যদিও তৃণমূল বিধায়ক চিরঞ্জিৎ চট্টোপাধ্যায়ের অভিযোগ কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে। তাঁর মতে এই কেসের দায়িত্ব তো সিবিআইয়ের হাতে আছে, তাহলে তারা কেন প্রকৃত অপরাধীকে খুঁজে বের করতে পারছে না?
আরজি কর পিজিটি ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রতিবাদীরা সিবিআই অফিসের বাইরে বিক্ষোভ করেছেন

চলতি মাসের ৯ তারিখ অভয়া কাণ্ডের ১ বছর পূর্ণ হবে। ন্যায় বিচার যে হয়নি, তা মানছেন রাজ্যের বেশিরভাগ মানুষই। গত বছর আরজি কর হাসপাতালে ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পর গঠিত চিকিৎসকদের ফোরাম ‘অভয়া মঞ্চ’-এর প্রতিনিধিরা শুক্রবার সল্টলেকের সিজিও কমপ্লেক্সে সিবিআই অফিসের সামনে একটি সমাবেশ করেন। ঝাড়ু হাতে বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন যে রাজ্য সরকারের সাথে যোগসাজশে কাজ করার কারণেই সিবিআই তদন্তে ‘বিলম্ব’ হচ্ছে। “সিবিআই রাজ্য সরকারের সাথে সমঝোতার জন্য কাজ করছে। আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার এত মাস পরেও, তারা এখনও কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি,” দাবি করেছেন অভয়া মঞ্চের যুগ্ম আহ্বায়ক তমোনাস চৌধুরী। গত বছরের ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে কর্তব্যরত স্নাতকোত্তর চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়েছিল, যা সারা দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। কলকাতা পুলিশ সঞ্জয় রাই নামে এক সিভিক পুলিশকে গ্রেপ্তার করে এবং কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে তদন্তের দায়িত্ব নেয় সিবিআই। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও সঞ্জয়কেই মামলার একমাত্র অভিযুক্ত করে। ২০ জানুয়ারী ট্রায়াল কোর্ট অভিযুক্ত সঞ্জয় রায়কে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়। মামলার কথিত ষড়যন্ত্রের দিকটি নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। প্রসঙ্গত, ঘটনার এক বছর পূর্তি উপলক্ষে ৯ আগস্ট কলকাতায় অপরাধের সাথে সম্পর্কিত দুটি কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ওই দিন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ি পর্যন্ত একটি মিছিল বের করার কথা রয়েছে। ৯ আগস্ট ‘অভয় মঞ্চ’-এর সদস্যরা ‘রক্ষা বন্ধন’ পালন করবেন এবং ১৪ আগস্ট, ফোরাম রাত ৯টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত কলকাতা এবং সংলগ্ন শহরতলির এলাকা জুড়ে ‘রাত্রি পুনরুদ্ধার’ পদযাত্রার ডাক দিয়েছে।