অভয়ার মায়ের উপর পুলিশি আক্রমণের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের

আরজি কর কাণ্ডের বর্ষপূর্তিতে মেয়ের ধর্ষণ ও খুনের বিচার চেয়ে গত ৯ অগস্ট নবান্ন অভিযানে পা মেলান অভয়ার বাবা-মা। পার্কস্ট্রিটের কাছে তাঁদের মিছিল আটকানো হয়। অভিযোগ ওঠে, সেইসময় নির্যাতিতার বাবা-মাকে পুলিশ মারধর করে। তারপরও তাঁরা নবান্নে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকেন। কিন্তু রেসকোর্সের পাশে অবস্থান চলাকালীনই অসুস্থ হয়ে পড়েন অভয়ার মা। চোখেমুখে জল দেওয়ার পরেও অসুস্থ বোধ করতে থাকেন তিনি। সেই পরিস্থিতিতে নির্যাতিতার মা এবং বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গত রবিবার হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় অভয়ার মাকে। এবার এই ঘটনায় পুলিশের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দায়ের করলেন অভয়ার বাবা। জানা যাচ্ছে, সোমবার শেক্সপিয়র সরণী থানায় অনলাইনে একটি মেইল পাঠিয়ে অভিযোগ দায়ের করেছেন তিনি। অভিযোগপত্রে অভয়ার বাবার দাবি, পুলিশ অভয়ার মায়ের মাথায় ও পিঠে আঘাত করে। এর জেরে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। যদিও এর আগে নির্যাতিতার বাবা অভিযোগ করেছিলেন, তাঁর স্ত্রীর কপালে যে চোট লেগেছে, সেই সংক্রান্ত রিপোর্ট নাকি হাসাপতালের তরফ থেকে ‘বদলে’ ফেলা হয়েছিল। তিনি আরও অভিযোগ করেছিলেন, সরকারের চাপে হাসপাতাল তাঁর স্ত্রীকে ভর্তি নেয়নি। যদিও মাথায় চোট লাগায় নির্যাতিতার মাকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রেখেছিল হাসপাতাল। রবিবার তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ নিয়ে অভয়ার মা সেসময় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিল, “কলকাতা পুলিশই আমাকে মেরেছে। পুরুষ ও মহিলা পুলিশ মিলে আমাকে লাঠিপেটা করেছে। আমার শাঁখা ভেঙে দিয়েছে। আমার পিঠে লেগেছে। আমাকে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এমনকী ওর বাবাকেও মেরেছে। কেন আমায় মারা হল? কেন আমার মেয়েকে কাজের জায়গায় মারা হল? কেন প্রশাসন তৎপর হল না সেদিন?” যদিও পুলিশের তরফ থেকে অভয়ার মায়ের ওপর লাঠিচার্জের সমস্ত অভিযোগই অস্বীকার করা হয়। এবার সেই পুলিশের বিরুদ্ধেই থানায় লিখিত অভিযোগ জানালেন অভয়ার বাবা। তাঁর বাবার অভিযোগ, “রাজ্য সরকারের চাপে মেডিক্যাল রিপোর্টও বদলে দিয়েছিল হাসপাতাল। ডিসচার্জ রিপোর্টে কোথাও রোগীর বয়ানে আঘাতের কথা উল্লেখ ছিল না। পরে আমাদের আইনজীবীর প্রশ্নের মুখে পড়ে রিপোর্ট বদল করে মায়ের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয় হাসাপাতালের ডিসচার্জ রিপোর্টে।” এবার সেই রিপোর্টের কপি সহ মেইল করে সেক্সপীয়র সরণী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন অভয়ার বাবা। এখন দেখার, এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ আদৌ কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা।
নবান্ন অভিযান ঘিরে ধুন্ধুমার, পার্ক স্ট্রিটে অবস্থান বিক্ষোভ শুভেন্দুর

আরজি করের চিকিৎসকের খুন ও ধর্ষণ কাণ্ডের একবছর পূর্ণ হল। কিন্তু বছর ঘুরলেও তাঁর মেয়ে ন্যায় বিচার পায়নি বলে সংবাদ মাধ্যমের সামনে বারবার সরব হয়েছেন অভয়ার বাবা-মা। এমনকী গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গেও দেখা করতে যান। কিন্তু অমিত শাহ অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় সাক্ষাৎ হয়নি। পরে সিবিআই ডিরেক্টরের সঙ্গে দেখা করে একপ্রকার হতাশা নিয়েই কলকাতায় ফেরে অভয়ার বাবা-মা। এই আবহে আজ শনিবার নবান্ন অভিযানের ডাক দেওয়া হয়েছিল। আর সেই অভিযান ঘিরেই এবার রণক্ষেত্রে পরিণত হল মহানগরী। এই আবহে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করলেন, আরজি করে নির্যাতিতার মা-বাবার ওপর লাঠি চালিয়েছে পুলিশ। পার্ক স্ট্রিট থেকে ডোরিনা ক্রসিং, হাওড়া ময়দান থেকে সাঁতরাগাছিতে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। এদিকে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে নবান্ন অভিযানের শুরুতেই বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকে বাধা দেয় পুলিশ। এরপর নির্যাতিতার মা-বাবার ওপর পুলিশি হামলার প্রতিবাদে রাস্তায় বসে পড়ে প্রতিবাদ শুরু করেন শুভেন্দু অধিকারী। এমনকী নবান্ন অভিযানে গিয়ে পুলিশের লাঠিতে মাথা ফেটেছে বিজেপির ব্যারাকপুর সাংগঠনিক যুব নেতা প্রিয়াংগু পান্ডের। আহত হয়েছে বেশ কিছু কর্মী-সমর্থক। বিজেপির তরফ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পুলিশের লাঠির আঘাতে নির্যাতিতার মায়ের কপালে চোট লেগেছে। তাঁর কপাল ফুলে গিয়েছে। এদিন নবান্ন অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন অভয়ার বাবা-মা। যদিও এই অভিযানে শুভেন্দু অধিকারীর নাম জড়িয়ে পড়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের তরফ থেকে আগেই জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল তারা এই কর্মসূচিতে অংশ নেবে না। শনিবার পরিকল্পনা মাফিক ধর্মতলা থেকে প্রতিবাদীদের একটি মিছিল নবান্নের উদ্দেশে রওনা দেয়। সেই মিছিলেই সামনের সারিতে ছিলেন নির্যাতিতার মা-বাবা। কিন্তু পার্কস্ট্রিট মোড়েই মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। তার কিছুক্ষণ পরেই আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। সেই সময়েই নির্যাতিতার মা আঘাত পান বলে দাবি করা হচ্ছে। অন্যদিকে নির্যতিতার বাবার দাবি, “আমরা যে গাড়িতে করে আসছিলাম, তার নম্বর সব জায়গা দেওয়া হয়েছে। আমাদের গাড়ি বার বার আটকানো হয়েছে। বলতে গেলে পুলিশের সঙ্গে লুকোচুরি করে এখানে পৌঁছেছি। হাই কোর্ট শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অনুমতি দিয়েছে। তার পরেও বিভিন্ন জায়গায় ব্যারিকেড করেছে পুলিশ।’ অভয়ার বাবার সুরে সুর মিলিয়ে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আমাদের শান্তিপূর্ণ মিছিল আটকাতে পুলিশ যেভাবে ব্যারিকেড দিয়েছে, যেভাবে নিরীহদের উপর পুলিশ নির্বিচারে লাঠি চালিয়েছে তাতেই স্পষ্ট যে মুখ্যমন্ত্রী মানবিক নন। তিনিও চান না অভয়া বিচার পাক। আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভয় পেয়েছেন।”
নবান্ন নয়, আইন মেনে প্রতিবাদ সভা করতে হবে সাঁতরাগাছি বাস স্ট্যান্ড এবং রানী রাসমণিতে, সিদ্ধান্ত পুলিশ প্রশাসনের

শনিবারের নবান্ন অভিযান নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত নিল পুলিশ প্রশাসন। নবান্ন নয়, শনিবার অর্থাৎ ৯ আগষ্টের প্রতিবাদ সভা করতে হবে সাতরাগাছি বাস স্ট্যান্ড এবং রানী রাসমণি এভিনিউতে। প্রসঙ্গত শনিবারের এই নবান্ন অভিযানের বিরোধিতা করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। একটি মামলা দায়ের করেন হাওড়া ব্যবসায়ী সমিতি অপর একটি জনস্বাস্থ্য মামলা দায়ের করেন হাওড়ার জনৈক বাসিন্দা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার সাংবাদিক সম্মেলন করেন এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) জাভেদ শামীম, এডিজি ( দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতীম সরকার, কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ কুমার ভর্মা ও হাওড়ার পুলিশ কমিশনার প্রবীণ কুমার ত্রিপাঠী। সেখানেই বেশ কিছু নির্দেশকা দেওয়া হয়, সাংবাদিকদের সম্মেলনে এডিজি ( দক্ষিণবঙ্গ) সুপ্রতীম সরকার জানান,” যেহেতু নবান্ন রাজ্যের প্রধান সচিবালয় স্বাভাবিকভাবেই নবান্ন বা তার আশেপাশের অঞ্চল হাই সিকিউরিটি জোন। স্বাভাবিকভাবে ওখানে বিএনএসএস – ১৬৩ ( ১৪৪ ধারা) জারি থাকবে। সেই কারণে মহামান্য আদালত আমাদের দুটি অন্য জায়গা নির্ধারণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সেই মতো হাওড়ার জন্য সাঁতরাগাছি বাস স্ট্যান্ড এবং কলকাতার জন্য রানী রাসমণি এভিনিউ স্থির করা হয়েছে। শান্তিপূর্ণ ভাবে এই দুই জায়গায় জমায়েত ও প্রতিবাদ সভা করা যাবে, পুলিশ সব ধরনের সাহায্য করবে।” তবে শনিবারের এই নবান্ন অভিযান কর্মসুচির জন্য কোনো অনুমতি নেওয়া হয়নি বলে এদিন জানান এডিজি ( আইনশৃঙ্খলা) জাভেদ শামীম , তিনি বলেন,” শনিবারের এই কর্মসূচি নিয়ে হাওড়া পুলিশ কমিশনারেট, কলকাতা পুলিশ বা ভবানী ভবনে এখনো পর্যন্ত কেউ কোন অনুভূতির জন্য আবেদন করেননি. তবে আদালতের নির্দেশ মেনে এই অভিযান শান্তিপূর্ণভাবে আইন মেনে করতে হবে কোন ব্যক্তি বা সংগঠন যদি নির্দেশ অমান্য করে অশান্তি তৈরি সৃষ্টি করে তাহলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনী ব্যবস্থা নেবে।”