ঠাকুরবাড়িতে এসে সুব্রত ঠাকুরের রোষের মুখে পড়লেন কংগ্রেস নেত্রী

ঠাকুরবাড়ির মন্দির যেন রাজনীতি মুক্ত থাকে, শুক্রবার ঠাকুরবাড়িতে এসে এমনই বার্তা দিলেন কংগ্রেস নেত্রী ইন্দ্রাণী দত্ত মুখার্জি। প্রসঙ্গত, গত কয়েকদিন আগে ঠাকুরবাড়ির অন্দরের কলহ প্রকাশ্যে চলে আসে। বিজেপি সাংসদ তথা কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর দাদা তথা গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের দ্বন্দ্ব নিয়ে উত্তাল হয়ে ওঠে বঙ্গ রাজনীতি। দুজনেই দুজনের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক মন্তব্য করতে থাকেন। এই আবহে শুক্রবার উত্তর ২৪ পরগণার ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়িতে আসেন প্রদেশ কংগ্রেসের নতুন জেলা সভানেত্রী ইন্দ্রাণী দত্ত চ্যাটার্জি। এদিন প্রথমে তিনি ঠাকুরবাড়ির মন্দিরে পুজো দেন। পরে ঠাকুরবাড়িতে শান্তনু এবং সুব্রত ঠাকুরের তত্ত্বাবধানে যে ধর্মীয় সার্টিফিকেট দেওয়ার ক্যাম্প চলছে, সেখানে যান এবং সাধারণ মতুয়াদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের বোঝান, কেন এখন তাদের সার্টিফিকেট দিয়ে হিন্দুত্বের প্রমাণ করতে হবে। তাদের কোন ভয় নেই। যাদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড আছে—যারা ভোট দেয় তারা এখানকার নাগরিক। সুব্রত ঠাকুরের বাড়ির সামনের ক্যাম্পে গিয়ে যখন তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন হঠাৎ করে সুব্রত ঠাকুর এসে সেখান থেকে তাঁকে চলে যেতে বলেন। তখন ইন্দ্রাণী দত্ত মুখার্জি সুব্রত ঠাকুরকে বলেন, তিনি কি পুজো দিতে আসতে পারেন না? উত্তরে সুব্রত ঠাকুরকে বলতে শোনা যায়, তাহলে মন্দিরের কাছে চলুন। এখানে কাজ চলছে, কেন মানুষের জমায়েত করছেন? পরে ইন্দ্রাণী দেবী দাবি করেন, তাঁরা এসেছিলেন একটা বার্তা দিতে, যাতে ঠাকুরবাড়ির এই মন্দির প্রাঙ্গণ রাজনীতি মুক্ত থাকে। কিন্তু সুব্রত ঠাকুর তাঁকে বের করে দিয়েছেন। পাশাপাশি এনআরসি(NRC) এবং এসআইআর(SIR) নিয়েও কেন্দ্র এবং রাজ্য সরকারকে তুলোধোনা করেন তিনি। যদিও এই বিষয়ে অল ইন্ডিয়া মতুয়া মহাসংঘের আইটি সেলের সদস্য এবং মতুয়া ধর্ম প্রচারক রাজদীপ রায় বলেন, “উনি যদি পুজো দিতে আসেন তাহলে ওঁনাকে হাজারবার স্বাগত জানাবো। কিন্তু রাজনীতির আগুনে রুটি সেঁকতে আসলে ফল হিতেবিপরীত হতে পারে। ধর্মীয় সার্টিফিকেট দেওয়ার নিয়ম নিয়ে কিছু বলার থাকলে আলোচনায় বসতে পারতেন।” একই সঙ্গে রাজদীপ বলেন, “উনি কি জানেন বাংলাদেশ থেকে কত মুসলিম এখানে এসে হিন্দু সেজে আছে। ধরা পড়েছে। নাগরিকত্বের আন্দোলন পিআর ঠাকুরের থেকে শুরু হয়েছিল। ভোটার কার্ড, আধার কার্ড থাকলে যদি কেউ নাগরিক হয় তাহলে পাসপোর্ট ভেরিফিকেশনে কেন ৭১ সালের দলিল চাইছে। কেনই বা এত আবেদন খারিজ করছে তার উত্তর দিক। ঠাকুরবাড়ি রাজনৈতিক রুটি সেঁকার জায়গা নয়।” সুব্রত ঠাকুরের প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, “সুব্রত ঠাকুর যা করেছে ঠিক করেছে। পুজো দিতে এসে উনি ক্যাম্পে গেছেন কী করতে।” যদিও এই বিষয়ে তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মমতা ঠাকুর বলেন, “যদি কেউ ঠাকুরবাড়িতে পুজো দিতে আসেন, তাহলে তাঁকে স্বাগত। কিন্তু রাজনীতি করতে আসলে আমরা তা মানবো না। ঠাকুবাড়িতে রাজনীতি আগেও ছিল, এবং ভবিষ্যতেও থাকবে।”
মতুয়া ঠাকুরবাড়িতে ফের প্রকাশ্যে বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব

ঠাকুরনগর ঠাকুরবাড়িতে মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় সার্টিফিকেট দেওয়া নিয়ে বিজেপির গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব আবারও প্রকাশ্যে। দ্বন্দ্ব বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ভাই তথা বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের মধ্যে। পারিবারিক বিবাদে ঠাকুর বাড়ির দুই ছেলে বনগাঁর বিজেপি সাংসদ শান্তনু ঠাকুর এবং গাইঘাটার বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের মধ্যে বেশ কিছুদিন ধরেই দূরত্ব বাড়ছিল। ঠাকুরবাড়ির অন্দরে এই গুনজন চলছিল অনেক আগে থেকেই। এবার সিএএ(CAA)-এর জন্য মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় সার্টিফিকেট দেওয়াকে কেন্দ্র করে শান্তনু ঠাকুর ও সুব্রত ঠাকুরের সেই দ্বন্দ্ব প্রকাশ্য এল। কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই কেন্দ্রীয় জাহাজ প্রতিমন্ত্রী শান্তনু ঠাকুর ঠাকুরবাড়ির নাঠ মন্দিরে মতুয়াদের সিএএ ফর্ম পূরণের জন্য ক্যাম্প করছিলেন। কিন্তু তাঁর দাদা সুব্রত ঠাকুরের অভিযোগ শান্তনু ইচ্ছে করে গায়ের জোরে এবং মন্ত্রীত্বের গরম দেখিয়ে ঠাকুর বাড়িতে কর্তৃত্ব ফলাতে চাইছে। সে বিষয়ে তাঁর মা ছোট ছেলে শান্তনুর সঙ্গে কথা বলতে গেলে মাকে নাকি গালিগালাজ করে শান্তনু। অন্যদিকে, সুব্রত ঠাকুর ও শান্তনু ঠাকুরের মা ছবিরানী ঠাকুরের অভিযোগ, শান্তনু ঠাকুর মতুয়া মহাসংঘে একচ্ছত্র আধিপত্য চালাচ্ছে। মতুয়া কার্ড ও ধর্মীয় কার্ড দেওয়ার জন্য শান্তনু ঠাকুর সাম্প্রতিক নাট মন্দিরে ক্যাম্প করেছে। সুব্রত ঠাকুর এই ক্যাম্পের প্রতিবাদ করেছে। তাই নিয়েই শুরু হয়েছে দুই ভাইয়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব। এমনকী এই দ্বন্দ্ব মেটাতে তৃণমূল সাংসদ মমতা ঠাকুরের দ্বারস্থ হয়েছেন শান্তনু ও সুব্রত ঠাকুরের মা ছবিরানী ঠাকুর। নাট মন্দিরে সুব্রত ঠাকুর মমতা ঠাকুরের সঙ্গে কথা বলেন। সুব্রত জানান, “জেঠিমার কাছে গিয়েছিলাম। এর মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই। আমি আমার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। ঠাকুরবাড়ির নাট মন্দির ভক্ত-সেবায়েতদের জন্য সংরক্ষিত। সেখানে ঠাকুরের নাম-গান হয়। সেসব বন্ধ করে শান্তনু মন্ত্রীত্বের জোরে সেখানে সিএএ ক্যাম্প করছে। আমি তার প্রতিবাদ করেছি। এ লড়াই আমার অধিকারের লড়াই।” পাশাপাশি মতুয়া ভক্তদের কাছে সুব্রত ঠাকুর আবেদন করেছেন, যাতে করে এই অন্যায় কাজের জন্য ভক্তরা তাঁকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে ফেলেন। তাঁর আরও অভিযোগ, শান্তনু নিজের মাকে অপমান করেছেন। এর বিচার চেয়ে তিনি ভক্তদের কাছে শান্তনুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার আবেদন জানিয়েছেন। সুব্রত ঠাকুরের মা ছবিরানী ঠাকুর দাবি করেছেন, “মতুয়া মহা সংঘের অধিকার নিয়ে আমাদের এই লড়াই। আমি আমার বড় জা-এর কাছে গিয়েছিলাম। যেহেতু এটা আমাদের পারিবারিক সমস্যা সেকারণে। এর মধ্যে কোনও রাজনীতি নেই। আমি কোনও রাজনিতি করি না।” তৃণমূল সাংসদ মমতা ঠাকুরের বক্তব্য, “সুব্রত ও ওর মা আমার কাছে এসেছিল। যেহেতু এটা ঠাকুরবাড়ির ব্যাপার সেকারণে। আমি মনে করি এই ঠাকুরবাড়িতে শান্তনুর যতটা অধিকার আছে, সুব্রতরও ততটাই। কিন্তু সুব্রতরও অধিকার বঞ্চিত করে ঠাকুরবাড়িতে শান্তনু একচ্ছত্র অধিকার আদায় করতে চাইছে। এটা অন্যায়।” যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শান্তনু ঠাকুর। তাঁর পাল্টা অভিযোগ সুব্রত তৃণমূলের মন্ত্রী হওয়ার জন্য এসব নাটক করছে। তৃণমূল সাংসদ মমতা ঠাকুরের সঙ্গে বিজেপি বিধায়ক সুব্রত ঠাকুরের দূরত্ব নাকি অনেকটাই কমেছে। এক সঙ্গে ছবিও দেখা যাচ্ছে। তাই শান্তনু ঠাকুরের পাল্টা মন্তব্য, “এটা বিজেপি জন্য ভালো বার্তা নয়।” শান্তনুর দাবি, “সুব্রত ঠাকুর পাঁচ বছর সবকিছু ছেড়ে অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিল। আমি মন্ত্রী হওয়ার পর এখন উড়ে এসে জুড়ে বসতে চাইছে। আমি মন্ত্রী এটা ও মেনে নিতে পারছে না। বিজেপি বিধায়ক হয়ে তো মন্ত্রী হতে পারবে না। তাই তৃণমূলে যাবে। বিজেপি টিকিট দিলে সেই টিকিটে জিতে তৃণমূলে গিয়ে মন্ত্রী হবে। তাই এসব নাটক করছে। নাটক না করলে তো আবার তৃণমূলে দাম পাবে না। তাই এই নাটক। সব মিলিয়ে ভোটের আগে ঠাকুরবাড়ির অন্দরে আবারও যে রাজনৈতিক পারদ চড়তে শুরু করেছে তা বলাই বাহুল্য।