এবার চোখ দিয়ে জল নয়, আগুন বেরোবে : মমতা

না এবার বৃষ্টিহীন ২১। ধর্মতলার শহীদ দিবস বৃষ্টিহীন! না এমন ছবি খুব একটা চোখে পড়েছে বলে মনে পড়ে না। তবে এবার ব্যতিক্রমী ২১ দেখল গোটা বাংলা। মঞ্চের সামনে ছাতা মাথায় সারি সারি মানুষের ভিড়। প্রতি বছর একুশের এটাই পরিচিত ছবি। তবে এবার? না। বৃষ্টি হল না একফোঁটাও। এই দিনে আকাশ জুড়ে ঝমঝম করে বৃষ্টি, তৃণমূল নেত্রীর কাছে যা ‘গুড লাক সাইন’। তবে এই ২১শে সেই পরিচিত বৃষ্টি না হওয়ার কারণ অবশ্য ব্যাখ্যা করলেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১শে জুলাইয়ের মঞ্চ থেকে তিনি বলেন, “এবার কেন বৃষ্টি হয়নি বলুন তো? এবার নতুন খেলা শুরু হয়েছে। চোখ দিয়ে জল নয়, এবার আগুন বেরোবে।” লক্ষ্য বিধানসভা নির্বাচন। আগামী বছরেই ফের ভোটাভুটি। একুশের মঞ্চ থেকে যেন ভোটের বাদ্যি বাজিয়ে দিলেন তৃণমূল নেত্রী। দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, “এবার খেলায় বোল্ড আউট করতে হবে। একেবারে ছক্কা মারতে হবে।” সেকথা মেনে ভোট প্রস্তুতি যে সোমবার থেকেই শুরু করে দিতে বললেন তৃণমূল নেত্রী।
একুশের মঞ্চে বাঙালি অস্মিতায় শান মমতার

তবে কি বাংলা ভাষা বাঁচাতে নতুন করে ভাষা আন্দোলন? ২১শের মঞ্চ থেকে সেই ইঙ্গিত দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার বাইরে বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলায় কথা বললেই জুটছে ‘বাংলাদেশি’ তকমা। বাংলা ভাষাকে বাঁচাতে এবার নতুন করে ঠিক সেই আন্দোলনেরই ডাক দিলেন বাংলার মু্খ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “বাংলা ভাষার উপর চলছে বিশাল সন্ত্রাস। কে কোন ভাষায় কথা বলবে, কে কী খাবে, তা নিয়েও বলে দেবে ওরা! জেনে রাখবেন, এখানে সবার অধিকার রক্ষিত হবে।” প্রয়োজনে নতুন করে ভাষা আন্দোলনের কথাও বললেন তৃণমূল সুপ্রিমো। শুধু বলেই ক্ষান্ত হলেন না। নিজের ভাষা রক্ষায় মঞ্চ থেকেই দলের জনপ্রতিনিধিদের নির্দিষ্ট কর্মসূচিও বেঁধে দিলেন। সব ভাষার মানুষকে নিয়ে শনি-রবিবার মিছিল-মিটিংয়ের কথা বললেন তিনি। মমতার কথায়, ”দলের সাংসদদের বলব, সমাজের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে নিয়ে ভাষা-শহিদ উদ্যানে ধরনায় বসুন।” ভাষা যখন রাজনীতির অঙ্গ, সেখানে বিনা যুদ্ধে এক ইঞ্চি পিছু হটতে নারাজ রাজনীতিতে পোড় খাওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেকথা তিনি সোচ্চারেই উচ্চারণ করলেন। বললেন, ”একদম ছেড়ে দেবেন না। মনে রাখবেন, আমাদের রাজ্যে সকলে নিজের নিজের ভাষায় নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন। আমরা সব ভাষাকে সমানভাবে সম্মান করি।” কিন্তু বাংলা ভাষা আর বাঙালির সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন তিনি।
“২৬শে ওদের দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলাব”—২১শের মঞ্চ থেকে চ্যালেঞ্জ অভিষেকের

এবার বিজেপিকে দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলানোর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার শহীদ দিবসের মঞ্চে এসে প্রথমে ১৯৯৩ সালের ২১শে জুলাইয়ের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তৃণমূল কংগ্রেসের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড।’ শহীদদের নামের তালিকায় মাল্যদানের পর রীতিমতো হাঁটু মুড়ে প্রণাম জানান অভিষেক। এদিন শুরু থেকেই বিজেপিকে নিয়ে ‘অ্যাটাকিং মুডে’ ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। আর বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালিদের নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে সরাসরি বিজেপিকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে অভিষেক বলেন, “আগে জয় শ্রী রাম বলত। ঠেলায় পড়ে এখন রাম ছেড়ে জয় মা কালী, জয় মা দুর্গা বলছে। ২৬-এর পর ওদের দিয়ে ‘জয় বাংলা’ বলিয়ে ছাড়ব।” উল্লেখ্য, সম্প্রতি দুর্গাপুরে জনসভা থেকে ‘জয় শ্রীরাম’-এর বদলে একাধিকবার ‘জয় মা দুর্গা- জয় মা কালী’ বলতে শোনা গিয়েছে খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে। এদিন নাম না করে এভাবেই প্রধানমন্ত্রীকেও আক্রমণ করলেন অভিষেক। বাম-কংগ্রেস নয়, নিজের বক্তব্যর প্রথম থেকে শেষ এদিন বিজেপিকে আক্রমণ শানান ডায়মন্ডহারবারের সাংসদ। একুশের জুলাইয়ের মঞ্চ থেকেই কার্যত ছাব্বিশের সুর বেঁধে দিলেন অভিষেক। বুঝিয়ে দিলেন বাম-কংগ্রেস নয়, এই রাজ্যে যে বিজেপি তৃণমূলের এক ও একমাত্র শত্রু। আর তাই এদিনের মঞ্চ থেকে বিজেপিকে গণতান্ত্রিকভাবে ‘ডিটেনশন ক্যাম্পে’ পাঠানোর ডাক দিলেন অভিষেক। তিনি বলেন, “বাংলার মানুষকে এরা ডিটেনশন ক্যাম্পে নিয়ে যেতে চায়। বিজেপিকে প্রথম থেকেই আমরা বাংলাবিরোধী বলেছি। আজ থেকে ১৬-১৭ মাস আগে আমরা ব্রিগেডে সমাবেশ করেছিলাম। তাতে স্লোগান ছিল, ‘জনতার গর্জন, বাংলা বিরোধীদের বিসর্জন।’ সেই দিন আমরা যে ডাক দিয়েছিলাম, সেটা শুধু স্লোগান না। ওটা বিজেপির চরিত্র উন্মোচন। শুধু রাজনৈতিক স্লোগান নয়। বিজেপি বাংলার সংস্কৃতি নিয়ে তাচ্ছিল্য করে, ময়দানে জিততে না পেরে নির্লজ্জের মতো গরিব মানুষকে মারার পরিকল্পনা করে। টাকা আটকে রাখে। ওদের একটাই পরিচয়, বাংলাবিরোধী।” ইতিমধ্যেই বিজেপি শাসিত রাজ্যে গুলোতে বাঙালিদের নির্যাতনের অভিযোগ আসছে জানিয়ে রাস্তায় নামতে দেখা গেছে তৃণমূল নেত্রীকে। এদিনের একুশের সভা থেকেও তা নিয়ে আওয়াজ তুললেন অভিষেক। ভিন রাজ্যে বাংলা বললে হেনস্তা নিয়ে সরব হলেন তিনি। বললেন, “বাংলায় কথা বললে অসমের মুখ্যমন্ত্রী বলছেন বাংলাদেশি। ১৫ দিন হয়ে গেল কী ব্যবস্থা নিয়েছে কেন্দ্রের সরকার? গর্ব করে বাংলায় কথা বলব। লোকসভায় আমরা এই সেশনে দরকারে বাংলায় কথা বলব। আগে ১০বার বলতাম, এবার ৫০০ বার বলব। তোমাদের কথায় বাংলা উঠবে বসবে?” তাঁর কথায়, বিজেপি বাংলায় মাটি শক্ত করতে পারেনি বলেই এখানকার বাসিন্দাদের উপর হেনস্তার ছক। তিনি বলেন, “বাংলায় ভোটে জিততে না পেরে এই ধরনের চক্রান্ত শুরু করেছে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে, ইডি-সিবিআইকে কাজে লাগিয়ে, এজেন্সিকে কাজে লাগিয়েও বাংলায় জিততে পারেনি বিজেপি। তাই এগুলো করছে।” এরপরই ২৬ সালে বাংলা থেকে বিজেপিকে উৎখাত করার ডাক দিয়ে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক বলেন,”আমি ভবিষ্যতবাণী করি না। কিন্তু করলে ভেবেচিন্তে বলি। যে কটা আবর্জনা রয়েছে তাদের ঝেঁটিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলতে হবে। আমি ২১শে খেলা হবে বলেছিলাম, এবার পদ্মফুল উপড়ে ফেলার ডাক দিলাম।” এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও বলেন, “একদিকে ইডি লাগিয়ে বিরোধী নেতাদের জেলে ঢোকানো হচ্ছে। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে কাজে লাগিয়ে ভোটাধিকার কেড়ে নিচ্ছে।’ চ্যালেঞ্জ করে অভিষেক বললেন, “মেরুদণ্ড বিক্রি করব না।”
বঙ্গ বিজেপি ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা : ফিরহাদ

একুশের মঞ্চ থেকে বিজেপিকে তীব্র আক্রমণ শানালেন ফিরহাদ হাকিম। সপ্তাহের শুরুতেই কলকাতা কার্যত জন-অরণ্যে পরিণত হয়েছে। ধর্মতলার রাস্তা একপ্রকার তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের দখলে। আর এই ভরা সভা থেকেই গেরুয়া শিবিরকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করে ফিরহাদ বলেন,”বাংলায় বেশি লাফালাফি করছে বিজেপি। মনে রাখবেন বঙ্গ বিজেপি আসলে ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চা।” এখানেই শেষ নয়, বিজেপির কারণে গোটা রাজ্যে সন্ত্রাসের পরিবেশ তৈরি হচ্ছে বলে মত ফিরহাদের, তিনি বলেন, “রাজ্যে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দিচ্ছে বিজেপি। গোটা দেশে বাঙালিদের নির্যাতন করা হচ্ছে বিজেপির কারণে। বাংলায় কথা বললে বাংলাদেশি বলে অত্যাচার করা হচ্ছে।” এদিন তার ভাষণে নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের কথাও উঠে আসে। তিনি বলেন,”আমরা সিপিএমের বিরুদ্ধে লড়াই করেছি। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরে লড়াই করেছি। সেসব যেন না ভুলে যাই।” এদিন বিজেপির পাশাপাশি সিপিএমকেও তীব্র আক্রমণ শানিয়ে ফিরহাদ বলেন, “আমরা সিপিআইএমের সঙ্গে লড়াই করেছি। মনে রাখতে হবে আজ শহীদদের রক্তেই বাংলা সিপিআইএম মুক্ত।”
তৃণমূলের সভাকে ডিস্টার্ব করতে শুভেন্দুর উত্তরকন্যার ডাক : শতাব্দী রায়

তৃণমূলের শহীদ দিবসকে ডিস্টার্ব করতে শুভেন্দুর পাল্টা সভা বলে রাজ্যের বিরোধী দলনেতাকে তীব্র কটাক্ষ করলেন তৃণমূল সাংসদ শতাব্দী রায়। তৃণমূলের শহীদ দিবসের দিন উত্তরকন্যা অভিযানের ডাক দিয়েছে বিজেপির যুব মোর্চা। যে সমাবেশে উপস্থিত থাকবেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। যা নিয়ে রীতিমতো রাজনৈতিক চর্চা শুরু হয়েছে রাজ্যজুড়ে। তবে তৃণমূলের শহীদ দিবসের দিনই শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা এই উত্তরকন্যা অভিযানকে তীব্র আক্রমণ করলেন বোলপুরের সাংসদ শতাব্দী রায়। সোমবার ধর্মতলায় শহীদ মঞ্চে এসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে শুভেন্দুকে আক্রমণ করে বোলপুরের সাংসদ বলেন, “একুশে জুলাই বহু বছর ধরে হয়ে আসছে, এটা একটা আবেগ। উনি নিজে যখন তৃণমূলে ছিলেন তখন নিজে এই সভায় বক্তব্য রেখেছেন। তাই আজ হঠাৎ করে দল-বদলে একই দিনে উত্তরকন্যা অভিযানের ডাক দিয়ে কার্যত একুশে জুলাই-এর কর্মসূচিকে ডিস্টার্ব করতে চাইছেন শুভেন্দু অধিকারী।” পাশাপাশি এদিন তিনি আরও বলেন, “এভাবে কোনও কিছুর পাল্টা ডাক দিয়ে সফলতা আসে না, মানুষ সব দেখছে সব বুঝছে। এটা ওনার মনে রাখা উচিত পালটা ডাক দিয়ে আসলে উনি তৃণমূলের আবেগকেই আঘাত করলেন।”